বাদশাহ নামদার

“রাজ্য হলো এমন এক রূপবতী তরুণী

যার ঠোঁটে চুমু খেতে হলে

সুতীক্ষ্ণ তরবারির প্রয়োজন হয়।”

ইতিহাসের সবসময় দু’টো দিক থাকে। একটি বিজয়ীর দৃষ্টিকোণ থেকে, আরেকটি বিজিতের দৃষ্টিকোণ থেকে। ঐতিহাসিক বই লেখার সময় সাধারণত বিজয়ীর জয়ের গল্পগুলোতেই আলোকপাত করা হয়। সেদিক থেকে ‘বাদশাহ নামদার’ বইটি অনেকটাই আলাদা। বইয়ের ভূমিকায় লেখক হুমায়ূন আহমেদ উল্লেখ করেছেন যে বাদশাহ হুমায়ূনের সাথে নামের মিল তাঁকে নিয়ে বই লিখতে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে থাকতে পারে। সেই হুমায়ূনের অনবরত হারের কিছুটা দায়ভার কিশোরকালে এই হুমায়ূনকে নিতে হয়েছিল বলে হয়ত সম্রাটের প্রতি এক প্রকার টান কাজ করত লেখকের। নিজের মিতার দুর্নাম কিছুটা লাঘব করতে চেয়েছিলেন বলেই হয়তো সম্রাট হুমায়ূনের অপরাজেয় চরিত্র নিয়ে লিখেছেন লেখক হুমায়ূন। যে সম্রাট হেরে গেছেন বারবার, কিন্তু পরাজিত হননি।

বইয়ের শুরু হয় মোগল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট হুমায়ূনের পিতা সম্রাট বাবরকে দিয়ে। ছেলের খেয়ালী মনোভাব আর বাদশাহসুলভ আচরণের অভাব দেখে যিনি বরাবরই চিন্তিত ছিলেন। বাবার চিন্তাকে ঠিক প্রমাণিত করে এই খেয়ালীপনার বশেই বহু পাগলামো করে গেছেন হুমায়ূন। কিন্তু কোন এক ব্যখ্যার অতীত শক্তির কারণে পারও পেয়েছেন বারবার। জাদুবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, নিজের মহানুভবতা আর ক্ষমাশীলতার বলে শত্রুর চূড়ান্ত সমীহ আদায় করেছেন, আবার এই হুমায়ূনই নিজ হাতে শত শত মানুষকে নির্দ্বিধায় হত্যা করেছেন। এমনই অসংখ্য খামখেয়ালী কর্মকান্ডের উদাহরন নিজের চিরাচরিত লেখনীতে মলাটবন্দি করেছেন লেখক।

বই হিসেবে বিচার করতে গেলে এটি নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম সেরা রচনা। ইতিহাসের মত রসহীন একটি বিষয়কে কীভাবে এতটা আকর্ষণীয় করে লেখা যায় যাতে পাঠক শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এক নিঃশ্বাসে পড়তে বাধ্য হয় তা বোঝার জন্য এই বইটি না পড়লেই নয়। যদিও প্রত্যেকটি গল্পই সত্যি ঘটনা, এবং সে সম্পর্কে জায়গা বিশেষে লেখক রেফারেন্সও দিয়ে দিয়েছেন, তারপরও পুরো বইটিতে হুমায়ূন আহমেদের পরিচিত অনন্য লেখার ছাপ স্পষ্ট। বই জুড়ে বহু জায়গায় নিজের অনন্যসাধারণ রসবোধ আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় সুকৌশলে লুকিয়ে রেখেছেন যেগুলো পড়ে বারবার মুগ্ধ হতে হয়েছে।


“বন্ধু হবে যাদের সঙ্গে কখনো দেখা হবে না।

দুজনই থাকবে দু’জনের কাছে অদৃশ্য।

দৃশ্যমান থাকবে তাদের ভালবাসা”

ভালো লাগেনি এমন শুধু একটি জিনিসের কথাই বলতে হয়- শেষের দিকে গিয়ে মনে হয়েছে লেখক কিছুটা তাড়াহুড়ো করে লেখা শেষ করেছেন। হতে পারে বইটি শেষ হোক এমনটা চাইনি বলেই এমন মনে হয়েছে। কারণ যাই হোক, পড়ার পুরোটা সময় মনে হয়েছে এই বই অনন্তকাল ধরে পড়তে পারলেই বোধহয় ভালো হতো। সব মিলিয়ে নিঃসন্দেহে এটি বইয়ের প্রতি ভালবাসার পুনর্জন্ম দেওয়ার মত একটি বই।

Goodreads Rating: 4.29/5

আমার রেটিংঃ ৫/৫

রিভিউ কেমন লেগেছে আর এরপর কোন বইয়ের রিভিউ দেখতে চান কমেন্টে জানাবেন অবশ্যই। হ্যাপি রিডিং!