নিহির ভালোবাসা

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

লেখক: মোশতাক আহমেদ

প্রকাশক: নালন্দা (২০০৬)

পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১২৮

মানুষ যখন জানতে পারে তার মৃত্যু আসন্ন; তার কাছে দু’দিন অনেক সময়


সমুদ্রের পাড়। সম্পূর্ণ একা একজন মানুষকে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাকে ঘিরে রয়েছে আরো কিছু লোকজন যারা প্রার্থনা সঙ্গীতের মত কিছু একটা গাইছে। হঠাৎই সমুদ্রের ভেতর থেকে উঠে আসতে লাগল কিম্ভূতকিমাকার দেখতে এক প্রাণী। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার আগ্রহ বেঁধে রাখা মানুষটির দিকে। সেটিকে এগিয়ে আসতে দেখে পাড়ের মানুষগুলো ছুটতে শুরু করলো যে যার মত। প্রাণীটি এগিয়ে আসছে তো আসছে….

এমন একটি নাটকীয় দৃশ্যের মাধ্যমে শুরু ‘নিহির ভালোবাসা’ বইটির। মূল কাহিনী শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, দৃশ্যটির ঘটনাস্থল ‘লিপিল’ নামক এক ভিনগ্রহ। আর খুঁটিতে বেঁধে রাখা ব্যক্তি এ গল্পের মূল চরিত্র, নিও। পেশায় সে একজন মহাকাশযাত্রী, যে এক দু্র্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ঘটনাক্রমে লিপিল গ্রহে অবতরণ করে। তার সাথে সঙ্গী হিসেবে থাকে উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন দুই রোবট, ইশি এবং পিপি। এই দুই রোবটের যত্ন ও সহায়তায় অপরিচিত এক গ্রহে আহত অবস্থায় আটকা পড়ার পরেও প্রাণে বেঁচে যায় নিও। আর এই লিপিল গ্রহে অনুসন্ধান চালানোর সময়েই ঘটনাক্রমে নিওর পরিচয় হয় অপূর্ব রূপসী এবং বুদ্ধিমতি মেয়ে নিহির সাথে। এই নিহিই তাকে রক্ষা করে সামুদ্রিক দানবের হাত থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নিওকে সাহায্য করার পরিণতি হিসেবে মৃত্যুমুখে পতিত হয় নিহি নিজেই। কিন্তু নিজের প্রাণ রক্ষাকারীর বিপদে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র নয় ক্যাপ্টেন নিও। আবারও অন্যকে সাহায্য করতে নিজের জীবন বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে।

Source: Google

এভাবে বারবার বহু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে অগ্রসর হয় নিও-নিহির গল্প। গল্পের ঘটনাস্থল লিপিল গ্রহকে অনেকটা পৃথিবীর আদলেই কল্পনা করা হয়েছে, তবে তার সৌন্দর্য পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি আর সাথে যোগ করা হয়েছে কিছু ফ্যান্টাসির উপাদান। একইভাবে লিপিলের অধিবাসীরাও দেখতে হুবহু মানুষের মত হলেও তাদের জৈবিক গঠন আর সমাজ ব্যবস্থাতেও রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। লিপিলের মানুষের জীবনে সঙ্গীত অপরিহার্য এক বিষয়, আর সেটাকে লেখক মাধুর্যের সাথে মূল গল্পের সাথে সন্নিবেশ করেছেন। তবে বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত স্থান এবং বস্তুর প্রাণবন্ত বর্ণনা। পড়তে পড়তে যেন জায়গাগুলো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম, আর বারবারই ইচ্ছে হচ্ছিল এক্ষুণি স্পেসশিপে করে লিপিলের পথে রওনা হতে। সেই সাথে ইশি আর পিপির সার্বক্ষণিক খুঁনসুটিও কিছু বাড়তি আনন্দ দিয়েছে। ওদের কথা পড়ে কেন যেন বারবার স্টার ওয়ার্স এর আরটুডিটু এবং সিথ্রিপিও এর সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম।

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বলা হলেও কিছু কিছু জায়গায় বইটিকে তরুণ প্রেমের গল্প বলেই বেশি মনে হয়েছে। বৈজ্ঞানিক কাহিনীর উপাদানও যথেষ্ট ছিল না আমার মতে। লেখক হয়তো বিজ্ঞানকে উপজীব্য করে মানবিক বিষয়গুলোকেই বেশি দৃষ্টিগোচর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সেটা ন্যাকামোর পর্যায়ে চলে গেছে। বিশেষ করে নিহির প্রাথমিক পরিচয় দেবার সময় তার অনিন্দ্য সৌন্দর্যের বর্ণনা আর তা দেখে নিওর অপার মুগ্ধতা কিছুটা হাস্যকরই বটে। নিহির মত বুদ্ধিমান, দয়ালু, স্নেহপ্রবণ একটা চরিত্রকে আকর্ষণীয় করতে অযথা স্বর্গীয় রুপের অতিরন্জনের প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয়না। আর তাছাড়া ক্যাপ্টেন নিওর মত একজন তুখোড় এবং স্মার্ট একজন মহাকাশচারী একজন মেয়ের সৌন্দর্য দেখে এতটা মোহগ্রস্ত হবে সেটাও কিছুটা অবাস্তবই লাগার কথা পাঠকের চোখে। তবে বইটির সমাপ্তি যথেষ্ট পরিণত এবং মানানসই বলেই মনে হয়েছে।

Source: Google

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে হাতেগোনা কিছু লেখক বাদে কিশোর-কিশোরীদের জন্য ভালো বই, যাকে বলে ইয়াং-এ্যাডাল্ট, প্রায় লেখা হয়না বললেই চলে। সেজন্য এই ধারার বই লেখায় লেখককে সাধুবাদ জানাতেই হয়। অল্প সময়ে হাল্কা মেজাজের বই পড়তে চাইলে যেকোন বয়সের পাঠক পড়তে পারেন ‘নিহির ভালোবাসা’।

Goodreads Rating: ৩.৮৫/৫

আমার রেটিং: ৩.২৫/৫

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s