সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ

লেখক: সুহান রিজওয়ান

প্রকাশক: ঐতিহ্য (২০১৬)

প্রচ্ছদ: স্যাম

মুদ্রিত মূল্য: সাতশত টাকা


ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করে না, কিন্তু ছন্দিত হয়।

‘সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ’ পড়তে গিয়ে এই কথাটিই বারবার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল। যখনই কেউ অতীতের শিক্ষাকে উপেক্ষা করেছে, দেখা গেছে সেই ভুল চরম থেকে চরমতর উপায়ে ফিরে এসে তাদের পতন ঘটিয়েছে। সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসের নটবরদের জন্য এই কথাটি আরও অধিক পরিমাণে প্রযোজ্য।এই বইতেও সে কথাই বারবার ফিরে ফিরে এসেছে।


বইয়ের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ আর তার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের জানা-অজানা ঘটনাবলি, যার কেন্দ্র তাজউদ্দীন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যেসব বই প্রচলিত আছে, ফিকশন এবং নন-ফিকশন ঊভয়ই, সেসব বইয়ে সাধারণত বঙ্গবন্ধুই একক তেজোদ্দীপ্ত সূর্য হিসেবে উঠে আসেন। কিন্তু তার আশেপাশে যারা গ্রহ-উপগ্রহ হিসেবে পুরোটা সময় ধরে ছিলেন, যাদের প্রভাবে ইতিহাস আকৃতি পেয়েছে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও তাদের ব্যক্তিগত ইতিহাসকে খুব বেশি হলে আবছায়াই বলা যায়। যুদ্ধ চলাকালীন ও তার পরের সময়ে অজস্র লিখিত রেকর্ড ধ্বংস হয়ে যাওয়া তার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যের এই জায়গাটাতে বরাবরই বিশাল একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে সহজপাঠ্য সহজপাচ্য ভাষায় ইতিহাস পৌছে দেবার মত বইয়ের প্রয়োজনীয়তা তাই আমি তীব্রভাবে অনুভব করি। সেদিক থেকে লেখকের একটা বড় ধন্যবাদ প্রাপ্য এমন একজন মানুষকে নিয়ে লেখার জন্য, যার সম্পর্কে তাঁর আশেপাশের মানুষের স্মৃতি ছাড়া আর তেমন কিছুকেই সম্বল করার মত ছিল না। এরকম বই লেখা তাই মোটামুটি হারকিউলিয়ান একটা কাজই ছিলো বলে আমার মনে হয়।



গল্পের শুরু স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক চারদিন পরে, যখন দু’জন মানুষ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সীমান্ত পার করে যাচ্ছিলেন যুদ্ধে ভারতের কাছে সাহায্য লাভের আশায়। ময়লা গেন্জি আর লুঙ্গি পরিহিত দু’জন মানুষ, যারা কিনা একটি দেশের রাষ্ট্রদূত! এরপরে প্রথম পর্বের কাহিনীপ্রবাহ এগিয়ে গেছে যুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন দিকের বহুমাত্রিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। সম্মুখ যুদ্ধের নৃশংসতা আমরা কম বেশি সবাই জানি। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে মনস্তাত্বিক সমরকৌশল চলেছে, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নানা দিক থেকে তা যে মানুষটি নিপুণ হাতে নীরবে পরিচালনা করে গেছেন তিনি তাজউদ্দীন আহমেদ। যুদ্ধ যতটা না অস্ত্রের খেলা তার চেয়েও বেশি যে বুদ্ধির খেলা সেটা সম্ভবত তার মত গভীরভাবে সে সময়ে খুব বেশি মানুষ অনুধাবন করতে পারেননি। একইসাথে পাঁচ বছরের পরিক্রমায় নানা নাটকীয়তা, বিশ্বাসঘাতকতা আর রহস্যময়তার কথাও উঠে এসেছে বইজুড়ে, সিনেমার কল্পনার মতই সাসপেন্সফুল যা।

যুদ্ধের এই প্রচারবিমুখ নায়ক দ্বিতীয় পর্বে এসে হলেন চরম ট্র্যাজেডির শিকার। এ পর্যায়ে বইয়ের ফোকাস তার উপর থেকে কিছুটা সরে গিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক কূটকৌশলের উপরে গিয়ে পড়েছে, কিন্তু তাজউদ্দীন-ই যে এই গল্পের ট্র্যাজিক হিরো সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। তিনি ছিলেন সত্যিকারের স্টেটসম্যান, রাজনীতিবিদ নয়। তাই বারবার নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে, কিন্তু ‘রাজ’ এর জন্যে ‘নীতি’র বিসর্জন দেননি একবারও।

পুরো বইজুড়ে তাজউদ্দীন আহমেদের সারল্য, অনাড়ম্বরতা, তীক্ষ্নবুদ্ধিমত্তা আর সততা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। একজন প্রধানমণ্ত্রী যিনি যুদ্ধের সময় রাতে একখানা শার্ট নিজের হাতে ধুয়ে শুকিয়ে পরদিন আবার সেটি গায়ে দিয়ে অফিস করেছেন। আবার একেক সময়ে তাঁর একেকটি ভুল পদক্ষেপে তীব্র আফসোস হয়েছে, পরিণতি কী হবে জেনেও আশায় বুক বাঁধতে হয়েছে। প্রতিভাবান, ব্যক্তিত্বশীল, অন্তর্মুখী যেই মানুষটি শেখ মুজিব এবং বাংলাদেশের জন্য সমস্ত ত্যাগ করেছিলেন তিনিই জীবন সায়াহ্নে প্রচন্ড অভিমান নিয়ে, কাজের স্বীকৃতি না নিয়ে চলে গেলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের মাথার মুকুট হওয়ার কথা ছিলো যার, তিনি শিরস্ত্রাণ হয়েই রইলেন।

এছাড়াও কাহিনীর ফাঁকে ফাঁকে বহু মানুষের গল্প উঠে এসেছে যারা বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড়, ভালো-মন্দ বিভিন্ন উপায়ে মূল কাহিনীতে ভূমিকা রেখেছেন কিংবা রাখেননি, যাদের কেউ কেউ ইতিহাসের কৃপায় মানুষের মনে রয়ে গেছেন, আবার কেউ ভেসে গেছেন বিস্মৃতির স্রোতে। জাহানারা ইমাম, শহীদ রুমী কিংবা এম আর আখতার মুকুলের মত মানুষের নাম দেখে পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ার অনুভূতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আবার আবদুল বাতেন কিংবা তারেকের মত অজানা মানুষের করুণ পরিণতি দেখে পাঠকের কষ্টটাও সহজেই বোধগম্য।

মুখবন্ধতেই তাজউদ্দীন সম্পর্কে লেখক তাঁর মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। অনেকের কাছে মনে হতে পারে এই ব্যক্তিগত মুগ্ধতা ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের নৈর্ব্যক্তিক বিবরণের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে ছিল, কিন্তু মনে রাখতে হবে এটি ইতিহাস গ্রন্থ নয় মোটেই, ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস। ইতিহাসের কাঠখোট্টা তথ্য-উপাত্ত জানতে চাইলে পাঠকদের বইয়ের পেছনে দেওয়া রেফারেন্স লিস্টের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

বইটির লেখা বেশ সাবলীল মনে হয়েছে আমার কাছে। যদিও কিছুদূর পরপর অপ্রয়োজনীয় মেটাফোরের কারণে পড়ার ছন্দ কেটে গেছে বারবার, বিশেষ করে দ্বিতীয় পর্বে। শেষের দিকে গিয়ে ৩ নভেম্বরের পরের ঘটনাবলী হঠাৎ তাড়াহুড়ো করেই কোনরকম শেষ করে দেয়া হয়েছে এমন মনে হয়েছে। হতে পারে সে ইতিহাসের আরো গভীরে যাওয়া আরো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে এমন হয়েছে, কিন্তু এতদূর টেনে না নিয়ে আরেকটু আগেই শেষ করে দেয়া হলে কাহিনীর রেশটা আরো দীর্ঘসময় উপভোগ্য হতো। একদম শেষে তাজউদ্দীন আহমেদের কন্যার সাথে লেখকের সাক্ষাতের বিষয়টিও কিছুটা অতিরিক্ত মনে হয়েছে। সে যাই হোক, আশা করি এর পরের সময়কাল নিয়ে লেখক ভবিষ্যতে আরও ভালো ভালো বই লিখবেন।

পাঠক যদি আমার মত ফাঁকিবাজ হন যার ইতিহাসের শক্ত শক্ত নাম-তারিখ মুখস্থ করার চেয়ে গল্পের ছলে ইতিহাস জানাতে আগ্রহ বেশি তাহলে এই বই ভালো একটা শুরু হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ আর তার পরের সময়কার ক্রনোলজি বেশ স্পষ্টভাবে বোধগম্য। যদিও মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে সোজা বিসিএস গাইডের মুক্তিযুদ্ধ অংশ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গল্পের ধারা সাজানো হয়েছে তবে তেমনটা না-ও হতে পারে। আর যাই হোক, ইতিহাসের দিন-তারিখ তো আর পাল্টানো সম্ভব নয়।

সবশেষে বলবো বাংলাদেশের ইতিহাসে যারা কেবল পায়ের আঙুল ছুঁইয়েছেন, এখন পায়ের পাতা ডুবিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে চান, তারা পড়ে দেখতে পারেন। সাহিত্য কিংবা ইতিহাসের বিচারে ভালো লাগুক আর না লাগুক, তাজউদ্দীনকে পাঠক ভালো না বেসে পারবেন না বলেই আমার বিশ্বাস।

আমার রেটিং: ৩.৯/৫

গুডরিডস রেটিং: ৪.৬৫/৫

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s